নন-লাইফ বীমা কোম্পানিতে বিশেষ অডিট নিয়োগ দেয়ায় আইনি জটিলতা

নিজস্ব প্রতিবেদক: নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় খতিয়ে দেখতে বিশেষ অডিটর নিয়োগ দিতে গিয়ে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) । এতে বীমাখাতের বিদ্যমান আইনের বেশ কিছু ধারা নিয়ে আইনি জট দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি বীমা আইন ২০১০ এর ২৯ ধারা মতে ১৯টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনা ব্যয় খতিয়ে দেখতে বিশেষ অডিটর নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। এ আইনের ২৯ ধারা মতে প্রবিধান না করে এবং ৬৩ ধারা মতে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ না করেই বিশেষ অডিটর নিয়োগ দেয়ায় এ জটিলতা দেখা দিয়েছে।

এছাড়া, কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনাখাতে অতিরিক্ত ব্যয় করা টাকা পূণর্ভরণের সময় দেয়ার পর এ নিয়ে বিশেষ অডিটর নিয়োগ দেয়া যুক্তিযুক্ত কি না, এ সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠেছে।

বিষয়টি আরো জটিল করে তুলেছে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে শুধুমাত্র গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের বিশেষ অডিট স্থগিতে মন্ত্রণালয় নির্দেশ দেয়ায়। গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আবেদনের প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে এ স্থগিতদেশ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।

এদিকে, মাত্র ১৯টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানিতে অডিটর নিয়োগ দেয়ায় এসব কোম্পানি সম্পর্কে এক ধরণের নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।

বীমা আইন ২০১০এর ২৯ ধারা মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানিগুলোতে বিশেষ অডিট চালাতে পারবে। তবে তা অবশ্যই প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে হতে হবে। এর ব্যাখ্যায় বলা যায়, এ ধরণের বিশেষ অডিট চালানোর আগে প্রবিধান করতে হবে। এ ধরণের কোন প্রবিধান প্রণয়ন করতে পারেনি আইডিআরএ।

বীমা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা ২০১০ এর ২৯ ধারা মতে বিশেষ অডিটর নিয়োগ দেয়ায় এ আইনি প্রশ্ন উঠেছে। তবে ২৯ ধারার সঙ্গে ১৬০ ধারা উল্লেখ করলে এ জটিলতা পাশ কাটানো যেত বলে অভিমত তাদের।

এদিকে, নন-লাইফ বীমা ব্যবসার জন্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত প্রবিধানের গেজেট প্রকাশ করে আইডিআরএ। ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় প্রকাশের পরপরই সে গেজেট অকার্যকর করে দেয়া হয়। এর ফলে দেশের নন-লাইফ বীমা ব্যবসার জন্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ১৯৫৮ সালে বিধি কার্যকর হয়। কিন্তু প্রায় ৬০ বছর আগের এ বিধি সঙ্গত কারণেই অচল।

এমন অবস্থায়, ব্যবস্থাপনা ব্যয় বিষয়ে অডিট করা হবে কোন মানের ওপর ভিত্তি করে, এমন প্রশ্ন ওঠেছে বীমাখাতে।

অন্যদিকে, ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বিষয়ে কোম্পানিগুলোর সাথে অনুষ্ঠিত শুনানি শেষে ব্যবস্থাপনাখাতে অতিরিক্ত ব্যয় করা টাকা পূণর্ভরণের আদেশ দেয় আইডিআরএ। এ জন্য ৫ বছর সময় বেঁধে দেয়া হয় যা কোম্পানিগুলো প্রতিপালন করার অঙ্গীকার করে। একই বিষয়ে আবার অডিটর নিয়োগ দেয়া যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে, এ আইনি ত্রুটির সুযোগ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে আইডিআরএ’র নিয়োগ দেয়া বিশেষ অডিট স্থগিত করার আবেদন করে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। এর প্রেক্ষিতে ২৭ ডিসেম্বর অর্থমন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের বিশেষ অডিট স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়।

অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক গ্রীন ডেল্টার বিশেষ অডিট স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় ওই চিঠিতে।

আবেদনপত্রে অর্থমন্ত্রী নির্দেশটি ছিল, "জরুরী, বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় আছে। এই মুহুর্তে IDRA কর্তৃক Special Audit ব্যবস্থা স্থগিত রাখতে নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে।”

উল্লেখ্য, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে ১৫৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করে  গ্রীন ডেল্টা। অতিরিক্ত ব্যয়ের শীর্ষে ছিল গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স।

সূত্র মতে, গত বছরের জুন মাসে দেশের ৪৭টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানিকে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় আইডিআরএ। কোম্পানিগুলোর পাঠানো তথ্য অনুসারে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো উল্লেখিত সময়ে আইনি সীমার বাইরে ব্যয় করে ১ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা।

পরবর্তীতে কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেয় আইডিআরএ। কোম্পানিগুলোর ব্যাখার বিষয়ে গত জুলাই মাসে শুনানী করা হয়। ওই শুনানীতে ব্যবস্থাপনাখাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের টাকা পুনর্ভরণের নির্দেশ দেয়া হয়। এ জন্য ৫ বছর সময় দেয়া হয়। আইডিআরএ'র এ নির্দেশ প্রতিটি কোম্পানি প্রতিপালনের অঙ্গীকার করে।

আইডিআরএ গত বছর ১৯টি কোম্পানিতে বিশেষ অডিটর নিয়োগ করে। এর মধ্যে প্রথম দফায় ৯টি কোম্পানি ও ২য় দফায় ১০টি কোম্পানিতে অডিটর নিয়োগ দেয়া হয়। কোম্পানিগুলো হলো- গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, প্রগতি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স, এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স কন্টিনেন্টাল ইন্স্যূরেন্স, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স, পাইওনিয়র ইন্স্যুরেন্স, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, নর্দান ইন্স্যূরেন্স, তাকাফুল ইন্স্যূরেন্স মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স, জনতা ইন্স্যুরেন্স, প্রভাতি ইন্স্যুরেন্স।