জীবন বীমায় সঞ্চয়ের নিশ্চয়তা

কল্যাণ চক্রবর্তী:

আমাদের দেশের মানুয়ের কাছে জীবন বীমার কথা বললেই প্রথম যে আপত্তিটি আসে তা হলো বীমা সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নেই বা বীমা করলে টাকা পাওয়া যায় না। অথচ দেশের অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একমাত্র বীমার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সংস্থাটির কাজ হচ্ছে বীমা কোম্পানিগুলোর যে ফান্ড (FUND) থাকে, সেই ফান্ডের টাকা বীমা আইনের বিধান অনুযায়ী বিনিয়োগ হচ্ছে কিনা, তার তদারক করা। এ থেকে বুঝা যায় সরকার বীমা আইন করে বীমা নিয়ন্ত্রকের মাধ্যমে বীমা কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণ করছেন। অর্থাৎ জনগণের অর্থ পাহারার জন্য সরকারই অতন্দ্র প্রহরী হিসাবে বীমা নিয়ন্ত্রককে ক্ষমতা দিয়েছেন, যাতে জনগণের অর্থ বিফলে না যায়।

জীবন বীমা কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকদের দায় পরিশোধ করতে হয়। এর জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। জীবন বীমা কোম্পানী ধীরে ধীরে একটি ফান্ড সৃষ্টি করে যাকে লাইফ ফান্ড (Life Fund) বলা হয়। অন্য দিকে হিসাব অনুযায়ী কোম্পানীর প্রতি বৎসর একটি দায় থাকে। এই দায় প্রতি বৎসর বৃদ্ধি পেতে থাকে। গ্রাহকদের এই দায় পরিশোধ নিশ্চিত করার জন্য কোম্পানী এই লাইফ ফান্ড বিনিয়োগ করে লাভ করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার একটি বাধ্যবাধকতা রেখেছেন। সরকারী তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, বীমা কোম্পানীর প্রতি বৎসর যে পরিমাণ মোট দায় থাকবে সেই দায়ের সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবে এবং যথাযথ বিনিয়োগের প্রমাণপত্র কন্ট্রোলার অব ইনসিওরেন্সের নিকট তিন মাস অন্তর দেখাতে হবে। বিনিয়োগ কিভাবে কোথায় করা যাবে তাও সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

ক) শতকরা ৩০ ভাগ সরকারী খাতে।

খ) শতকরা ১০ ভাগ সরকার অনুমোদিত খাতে। অর্থাৎ যে সকল বিনিয়োগ খাতে সুদসহ আসল টাকা পরিশোধের জন্য সরকার নিশ্চয়তা দেয়।

গ) বাকী ৬০ ভাগ যে কোন অনুমোদিত বিনিয়োগ ব্যবস্থায়। অর্থাৎ যে সকল বিনিয়োগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা সম্পর্কে সরকার নিশ্চিত হয়ে সরকারী গেজেট-বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে “অনুমোদিত বিনিয়োগ” বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। (বীমা আইনের ২৭ ও ২৮ ধারা) । ১৯৩৮ সালের বীমা আইনের ২৯ ধারার ৮ উপধারা, ১৯৯২ সালের বীমা (সংশোধনী) অপঃ দ্বারা, সংশোধন করে বীমা কোম্পানীর ঋণ প্রদানের উপর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আয়কর পরিশোধ শেষে পূর্ব বৎসরের নীট লাভের শতকরা ১০ ভাগের বেশি ঋণ কোন বীমা কোম্পানী প্রদান করতে পারবে না।

ঘ) বীমা আইনে ৪০ ধারার বিধান মতে, জীবন বীমা ব্যবসার খরচ পরিচালনার জন্য যেমন এজেন্টদের কমিশন, কোম্পানী অন্যান্য খরচ, এক্ষেত্রে কোম্পানী প্রথম বৎসরের প্রিমিয়াম আয়ের সাথে একটি খরচের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কোন অবস্থায় এ নির্ধারিত খরচের সীমা অতিক্রম করা যাবে না। এদিকে সরকারের বীমা নিয়ন্ত্রক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছেন।

১৯৯২ সালের সংশোধনীতে ৪০ নম্বর বিধিটি সংশোধন করে বলা হয়েছে বীমা এজেন্ট বা এজেন্টের নিয়োগকর্তা ব্যাতিত কোন ব্যক্তি বীমা ব্যবসায় আনায়নের নামে কোনরূপ কমিশন লেনদেন বা কমিশন লেনদেনের জন্য চুক্তি করতে পারবে না।

ঙ) ৪২ ধারার সংশোধনীতে বলা হয়েছে জীবন বীমার এজেন্টরা সাধারণ বীমা এবং সাধারণ বীমার এজেন্টরা জীবন বীমা ব্যবসা করতে পারবেন না।

চ) বীমা আইনের ৭৮ ও ৩ (ক) ধারার বিধান অনুযায়ী, বীমা ব্যবসা শুরু করার পূর্বে গ্রাহকদের প্রাথমিক দায় পরিশোধের জন্য নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারের নিকট জমা রাখতে হয়। এ টাকা জমা না রাখলে বীমা ব্যবসা করার অনুমতি দেয়া হয় না। তাছাড়া জীবন বীমা কোম্পানীকে প্রত্যেক পরিকল্পের বিস্তারিত বিবরণ, প্রিমিয়াম রেট, বীমার শর্ত ইত্যাদি বীমা নিয়ন্ত্রকের কাছে দাখিল করতে হয়। তিনি তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বাজারে চালু করার অনুমতি দিয়ে থাকেন। তিনি অনুমতি না দিলে ঐ পরিকল্পনা বাজারে চালু করা যায় না।

ছ) বীমা আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক জীবন বীমা কোম্পানীকে তাদের বার্ষিক আয় ব্যয়ের নিখুঁত হিসাব কন্ট্রোলারের অফিসে দাখিল করতে হয়। কন্ট্রোলার তা পরীক্ষার জন্য Special Audit- এর ব্যবস্থা করে থাকেন।

জ) বীমা আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী, জীবন বীমা ব্যবসায়ের লাভ ক্ষতি পরীক্ষা করার জন্য প্রতি তিন বৎসর অন্তর অন্তর একজন যোগ্য এ্যাকচুয়ারীর সাহায্যে ভ্যালুয়েশন করা হয়। এটি বীমা আইনের অন্যতম বিধান। এই ভ্যালুয়েশনের রিপোর্ট বীমা নিয়ন্ত্রকের নিকট দাখিল করতে হয়।

ঝ) এছাড়া বীমা আইনের ৪৮ ধারা অনুযায়ী বীমা গ্রাহকের বৃহত্তর স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে বীমা কোম্পানীর পরিচালক মণ্ডলীর ৩ ভাগের ১ ভাগ পরিচালক পলিসি গ্রাহকদের মধ্যে থেকে নির্বাচন করতে হয়। বীমা গ্রাহকদের প্রতিনিধি হিসাবে তারা দেখবেন বীমা গ্রহীতাদের স্বার্থ ঠিক মত এবং বীমা আইন অনুযায়ী সঠিকভাবে রক্ষা করা হচ্ছে কিনা।

১৯৯২ সালে ৪৮ ধারার সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কোন বীমা কোম্পানী তিন জনের বেশি উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারবেন না। কোম্পানীর মালিক, শেয়ার হোল্ডার, পরিচালক কিংবা তাদের পরিবারের কোন সদস্য উপদেষ্টা পদে নিয়োগ লাভ করতে পারবেন না।

উল্লেখিত আলোচনা হতে দেখা যায় যে, জীবন বীমার টাকা অর্থাৎ জনসাধারণের অর্থ বীমা কোম্পানীর কাছে সম্পূর্ণ নিশ্চিত।। আর এই নিশ্চয়তা বিধান করার জন্য সরকার একজন বীমা নিয়ন্ত্রককে সদা অতন্দ্র প্রহরীর মত জাগ্রত রেখেছেন।

লেখক: সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সে কোম্পানি লিমিটেড’র এডিশনাল ম্যানেজিং ডাইরেক্টর অ্যান্ড সিএফও।